নব্বইয়ের দশকের ঝড় তোলা পর্দা কাঁপানো নায়ক সালমান শাহ।
বাংলা চলচ্চিত্র জগতের ‘রাজপুত্র’ বলা হয় সালমান শাহকে। মৃত্যুর দুই যুগ পর এখনও তার আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা । ক্ষণজন্মা এই নায়ক রেখে গেছেন ২৭টি চলচ্চিত্র এবং অগণিত ভক্ত।
বাংলা ছবির ক্ষণজন্মা এক নায়ক। অভিনয়জগতে এসে পেয়েছেন খ্যাতি, সুনাম; আর জয় করেছেন ভক্তের হৃদয়। যা বাংলা সিনেমায় আজও ইতিহাস হয়ে আছে। নিজের অভিনয়দক্ষতা, পোশাকে নতুনত্ব আর আধুনিকতার ছোঁয়ায় হয়েছেন স্বপ্নের নায়ক এবং স্থান করে নিয়েছেন সবার অন্তরে ।
১৯৭০ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিলেটে জন্মগ্রহণ করেন। বেঁচে থাকলে আজ (১৯ সেপ্টেম্বর) ৫০ বছরে পা দিতেন তিনি। বাংলা সিনেমা যত দিন রবে, ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে সালমান শাহর নাম। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সবাইকে কাঁদিয়ে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন এই নায়ক।
নব্বইয়ের দশকে রুপালি পর্দায় অভিষেক ঘটা সালমান শাহ পর্দা থেকে বেরিয়ে হয়ে উঠেছিলেন কোটি তরুণ-তরুণীর স্বপ্নের নায়ক। শুরুতেই বিশাল সাফল্য দিয়ে সালমান প্রাণসঞ্চার করে দিলেন মৃতপ্রায় চলচ্চিত্রে। তারপর শুধুই ইতিহাস। কেউ কেউ বলে থাকেন, সালমানের মতো জনপ্রিয় নায়ক হয়তো আর কখনোই কোনো দিন জন্মাবে না এই ইন্ডাস্ট্রিতে।
সালমান শাহর প্রকৃত নাম ছিল শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন। ১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন সালমান শাহ। বাবার নাম কমরউদ্দিন চৌধুরী এবং মায়ের নাম নীলা চৌধুরী। পরিবারের বড় ছেলে তিনি । তবে চলচ্চিত্রে তিনি সবার কাছে সালমান শাহ নামেই পরিচিত ছিলেন।
সালমান শাহ পড়াশোনা করেন খুলনার বয়রা মডেল হাই স্কুলে। ওই স্কুলে চিত্রনায়িকা মৌসুমী তার সহপাঠী ছিলেন। ১৯৯৩ সালে সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সিনেমার মাধ্যমে একই সঙ্গে দু’জনের চলচ্চিত্রে অভিষেক হয়। সেই থেকে একবারের জন্যও পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে।
সালমান শাহ দেশীয় সিনেমায় ধূমকেতুর মত ধরা দিয়েছিলেন। সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়ে প্রথম সিনেমায়ই সাফল্যের দেখা পান সালমান। তার পোশাক-পরিচ্ছদ এবং স্টাইল তরুণদের মন জয় করে নেয়।
মাত্র চার বছরের ক্যারিয়ারে ২৭টি ছবিতে অভিনয় করেছেন সালমান শাহ। প্রায় সবগুলোই সুপারহিট সিনেমা তাঁর। সালমান শাহ অভিনীত ছবিগুলোর মধ্যে অন্যতম অন্তরে অন্তরে, সুজন সখী, স্বপ্নের নায়ক, স্বপ্নের ঠিকানা, চাওয়া থেকে পাওয়া পাওয়া, জীবন সংসার, প্রেম প্রিয়াসী, সত্যের মৃত্যু নেই, মায়ের অধিকার, এই ঘর এই সংসার, তোমাকে চাই, আনন্দ অশ্রু, বুকের ভেতর আগুন ইত্যাদি।
সালমান শাহর সঙ্গে চিত্রনায়িকা শাবনূরের জুটি ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয়। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে সেরা জুটিও বলেন অনেকে। এই জুটির প্রতিটি ছবিই সুপারহিট। তাঁদের পর্দার রসায়ন আর বাস্তব জীবনের রসায়ন নিয়েও তুমুল আলোচনা ছিল। সালমান শাহর সঙ্গে শাবনূরের সে সময়কার সম্পর্ক নিয়ে এখনো নানা কল্পকথা আছে।
ক্যারিয়ারের শুরুতে সালমান শাহ কাজ করেছেন ছোট পর্দায়। ‘আকাশ ছোঁয়া’, ‘দোয়েল’, ‘সব পাখি ঘরে ফেরে’, ‘সৈকতে সারস’, ‘নয়ন’ ও ‘স্বপ্নের পৃথিবী’ নাটকে তাকে অভিনয় করতে দেখা গেছে। বিজ্ঞাপনেও কাজ করেছেন তিনি।
চলচ্চিত্রে অভিষেকের আগের বছর অর্থাৎ ১৯৯২ সালের ১২ আগস্ট তার খালার বান্ধবীর মেয়ে সামিরা হককে বিয়ে করেন সালমান শাহ। সামিরা ছিলেন বিউটি পার্লার ব্যবসায়ী। তিনি সালমানের দু’টি চলচ্চিত্রে তার পোশাক পরিকল্পনাকারী হিসেবেও কাজ করেন। দাম্পত্য জীবনের পাঁচ বছরের মাথায় ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর হঠাৎই সালমানের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ে। এদিন ঢাকার ইস্কাটনে নিজ বাসার সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় তার দেহ উদ্ধার করা হয়। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করা হলেও তার মৃত্যু নিয়ে রহস্য থেকে যায়।
এ বিষয়ে অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করেছিলেন তার বাবা প্রয়াত কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী। পরে
১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে অভিযোগ করে মামলাটিকে হত্যা মামলায় রূপান্তরিত করার আবেদন জানান তিনি। এরপর মারা যান সালমান শাহর বাবা কমরউদ্দিন। পরে ২০১৬ সালে এর মামলার দায়িত্ব পান অ্যাডভোকেট ফারুক আহমেদ।
নায়কের প্রয়াণ দিবসে (৬ সেপ্টেম্বর) মামলার অগ্রগতি বিষয়ে অ্যাডভোকেট ফারুক ইত্তেফাক অনলাইনকে জানান, দেরি হলেও ন্যায় বিচার পাওয়ার আশা রাখি আমরা। সব ঠিকঠাক থাকলে মামলাটি আগামী ৩০ অক্টোবর শুনানি হবে। তবে করোনার কারণে এর আগের বেশ কয়েকটি নির্ধারিত শুনানির তারিখ পিছিয়েছে বলে জানান তিনি।
ফারুক আহমেদ বলেন, সালমান শাহ মৃত্যুর পর নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে এই মামলার সঙ্গে ২০১৬ সালে সম্পৃক্ত হই। সর্বশেষ পিবিআই যে রিপোর্টটি দিয়েছে সেটি আমাদের বিপক্ষে যায়। আমরা এর বিপক্ষে নারাজি দাখিল করবো।
তিনি জানান, মামলার শুনানি করতে হলে সালমান শাহের মা নীলা চৌধুরীকেও উপস্থিত থাকতে হবে। ওনাকে আদালতের কাছে স্ট্যাটমেন্ট দিতে হবে। এ কারণে মামলাটির নতুন তারিখ নিতে হয়েছে।
মামলার বিষয়ে অ্যাড. ফারুক আহমেদ আরও বলেন, এই মামলার জন্য আমাদের লেগে থাকতে হবে। অনেক বিচারকই তো আসবেন। কারণ, জুডিশিয়ালি তদন্ত হওয়ার পর র্যাব থেকে তদন্তভার পিবিআইতে পাঠানো হয়েছে; যা আমাদের জন্য ভালো হয়েছে। এখন এই মামলা নিম্ন আদালতে আছে। পরপর জজকোর্ট, হাইকোর্ট, সুপ্রিমকোর্ট, ও রিভিউকোর্ট পর্যন্ত যাওয়ার সুযোগ আছে। কেউ যদি মনে করেন বাবা-মা মারা গেলে মামলা শেষ হয়ে যায়। সেটা ভুল। ক্রিমিনাল মামলা কখনো মরে না।
গত ৩ নভেম্বর ১৯৯৭ সালে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় সিআইডি। চূড়ান্ত প্রতিবেদনে সালমান শাহের মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করা হয়। ২৫ নভেম্বর ঢাকার সিএমএম আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন গৃহীত হয়। সিআইডি’র প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে তার বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী রিভিশন মাম২০০৩ সালের ১৯ মে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠায় আদালত। এরপর প্রায় ১৫ বছর মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে ছিল। ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট ঢাকার সিএমএম আদালতের বিচারক বিকাশ কুমার সাহার কাছে বিচার বিভাগীয় তদন্তের প্রতিবেদন দাখিল করেন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ইমদাদুল হক। এ প্রতিবেদনে সালমান শাহের মৃত্যুকে অপমৃত্যু হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ২০১৪ সালের ২১ ডিসেম্বর সালমান শাহের মা নীলা চৌধুরী ছেলের মৃত্যুতে বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান এবং ওই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি দেবেন বলে আবেদন করেন। ২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি নীলা চৌধুরী ঢাকা মহানগর হাকিম জাহাঙ্গীর হোসেনের আদালতে বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে নারাজির আবেদন দাখিল করেন। নারাজি আবেদনে উল্লেখ করা হয়, আজিজ মোহাম্মদ ভাইসহ ১১ জন তার ছেলে সালমান শাহের হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকতে পারেন।
মামলাটি এরপর র্যাব তদন্ত করে। তবে র্যাবের দ্বারা তদন্তের আদেশের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ গত বছরের ১৯ এপ্রিল মহানগর দায়রা জজ আদালতে একটি রিভিশন মামলা করে। ২০১৬ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বিশেষ জজ ৬-এর বিচারক ইমরুল কায়েস রাষ্ট্রপক্ষের রিভিশনটি মঞ্জুর করেন এবং র্যাবকে মামলাটি আর না তদন্ত করার আদেশ দেন। তখন থেকে মামলাটি তদন্তের দায়িত্বে আছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। সব ঠিকঠাক থাকলে মামলাটি আগামী ৩০ অক্টোবর শুনানি হবে।






0 Comments